
রাহমাতুল লিল আলামীন : করুণার ঝর্ণাধারা
পীরজাদা শাইখ সাইফুল্লাহ ফারুকী চরণদ্বীপি
রহমত আল্লাহ তায়ালার সিফতে ইলাহী তথা উপাস্যের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালা স্বীয় গুণকে পবিত্র কোরআনুল কারীমের বিভিন্ন স্থানে আলোকপাত করেছেন। আল্লাহর রহমত প্রতিটি বস্তুকে বেষ্টন করে রয়েছে। সমগ্র সৃষ্টির প্রতি আল্লাহ তায়ালার রহমতসমূহের সর্বাধিক উৎকৃষ্ট রহমত হলেন হুজুর করিম হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (দঃ)। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল লিল আলামীন’।
অনুবাদ: আর আমি তো আপনাকে সমস্ত বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। (সুরাতুল আম্বিয়া, আয়াত:১০৭) এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করছেন যে, নবী মুহাম্মদ (দ.)-কে তিনি সমস্ত বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। এমনকি কেবল পার্থিব জগতের জন্য তিনি রহমত নন, বরং রুহের জগত, ফেরেশতার জগত, কবর জগত এবং পরকাল জগতের জন্যও তিনি রহমত স্বরূপ। স্বীয় পবিত্র সত্তাকে জগতসমূহের রব ঘোষনায় মহান আল্লাহ বলেন, ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ অনুবাদ : সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি জগতসমূহের রব (প্রতিপালক)। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁরই প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ (দঃ)’কে জগতসমূহের রহমত ঘোষণায় ইরশাদ করেন, ‘ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল লিল আলামীন’ অনুবাদ: আর আমি তো আপনাকে জগতসমূহের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ এই আয়াতে আল্লাহর জালাল ও কামালের গুণাবলী রয়েছে। যেমন: মহত্ত্ব, আধিপত্য ও রবুবিয়্যাত। আর এগুলোই বান্দার কাছ থেকে আনুগত্য ও ইবাদত দাবি করে। আর ‘ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামীন’ আল্লাহর জামাল ও রহমতের গুণাবলী প্রকাশ পেয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টিকে আকৃষ্ট করা ও তাদের অন্তরকে জয় করা। যেন বলা হচ্ছে, রহমত (নবী দ.)-ই হলো আল্লাহর তাযীম ও প্রশংসার সবচেয়ে নিকটতম পথ। ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ এই আয়াতে রবুবিয়্যাতের পূর্ণতা আর ‘ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামীন’ আয়াতে রিসালাতের পূর্ণতা সম্পর্কে বিঘোষিত হয়েছে। সমগ্র কায়েনাত আল্লাহর প্রশংসার তাসবীহ পাঠ করছে। আর যেহেতু মানুষ ও জিন অন্ধকার থেকে নূরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য হেদায়াতের মুখাপেক্ষী ছিল, তাই আল্লাহ তাঁর নবী (দ.) কে পাঠিয়েছেন এই রহমতের দলীল হিসেবে। যাতে গোটা বিশ্ব এই নিয়ামতের পূর্ণতা প্রত্যক্ষ করে এবং আল্লাহ জাল্লা ওয়া ‘আলা সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশংসার উপযুক্ত হন। উভয় আয়াতে ব্যবহৃত ‘আলামীন’ শব্দের ব্যাপকতা ও ব্যঞ্জনা রয়েছে। আল্লাহর প্রশংসার কারণ তিনি সকল জগতের রব। আর রাসূল (দ.) কেও এই সকল জগতের জন্যই রহমত হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। এটা প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের পুরো পদ্ধতি রহমতের উপর প্রতিষ্ঠিত। রাহমাতুল লিল আলামীন সম্পর্কে নবী করিম রাউফুর রাহীম মুহাম্মদ (দঃ) এর পবিত্র মুখ নিঃসৃত হাদীস সমূহ সুস্পষ্ট বর্ণনা উল্লেখ রয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: ‘হে মানুষ, আমি তো কেবল এক উপহারস্বরূপ প্রাপ্ত রহমত।’ (সূত্র: আল মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন কৃত ইমাম হাকীম নিশাপুরী র.)। অপর হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (দ.)-কে বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি মুশরিকদের উপর বদদোয়া করুন। তিনি বললেন, অনুবাদ: আমি তো অভিসম্পাতকারীরূপে প্রেরিত হইনি; বরং প্রেরিত হয়েছি রহমত স্বরূপ। (সূত্র: সহিহ মুসলিম, অধ্যায় : সদ্ব্যবহার, আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার) অন্য হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “আল্লাহ আমাকে উপহারস্বরূপ রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন; আমাকে পাঠানো হয়েছে এক সম্প্রদায়কে উন্নত করতে এবং অন্য সম্প্রদায়কে অবনত করতে। (সূত্র: আল মুসনাদ: কৃত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ), আল মু’জামুল আওসাত কৃত ইমাম তাবারানী (রঃ) আহলে তাসাওউফ তথা আহলুল্লাহ আউলিয়ায়ে কেরামের দৃষ্টিকোণ হতে নবী করিম (দঃ) সৃষ্টির প্রতি কি রকম রহমত তা সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেছেন আরেফ বিল্লাহ হযরত ইসমাইল হক্কী (রঃ) স্বীয় তাফসির গ্রন্থে-‘হে প্রজ্ঞাবান! আল্লাহ তাআলা আমাদের জানিয়েছেন যে, তিনি সর্বপ্রথমে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নূর সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশ থেকে নিয়ে ধূলিকণা (মাটি) পর্যন্ত সমস্ত সৃষ্টিজগতকে তাঁর সেই নূরেরই অংশ থেকে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং দৃশ্য ও অদৃশ্য জগতে তাঁর আগমন হলো প্রতিটি বিদ্যমান সত্তার জন্য রহমত স্বরূপ; কেননা সবকিছুর সূচনা তাঁর থেকেই হয়েছে। অতএব, তাঁর সত্তাই হলো সৃষ্টির অস্তিত্ব, এবং তিনিই সৃষ্টির অস্তিত্ব লাভের কারণ ও সমগ্র সৃষ্টির ওপর মহান আল্লাহর রহমত বর্ষণের মূল মাধ্যম। সুতরাং তিনি এক পরিপূর্ণ ও পর্যাপ্ত রহমত (রহমতে কাফিয়া)। আরও অনুধাবন করুন যে, সমস্ত সৃষ্টিজগত ছিলো কুদরতের প্রশস্ততায় নিক্ষিপ্ত রূহহীন এক একটি প্রতি ছবি বা আকৃতি, যা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শুভ আগমনের অপেক্ষায় ছিলো। অতঃপর যখন তিনি এই জগতে আগমন করলেন, তখন জগত তাঁর অস্তিত্বের বরকতে জীবন লাভ করলো; কারণ তিনি হলেন সমস্ত সৃষ্টির মূল রূহ। হে বুদ্ধিমান! আরশ থেকে সুফলা ধরণী পর্যন্ত সমস্ত সৃষ্টিজগত নিখুঁত জ্ঞান ও মা’রিফাতের মাধ্যমে আল্লাহর অনাদি রহস্য অনুধাবনের ক্ষেত্রে অপূর্ণাঙ্গ হিসেবেই অস্তিত্ব লাভ করেছিলো। ফলে তারা উলূহিয়্যাতের (প্রভুত্বের) মহাসমুদ্রের তীর এবং কিবরিয়াতের (মহিমার) অগাধ সাগরের উপকূলে পৌঁছাতে অক্ষম ছিলো। অতঃপর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর অনাদি-অনন্ত মারিফাতের সত্য সম্বলিত জ্ঞান নিয়ে এই জগতের কায়া-কাঠামোর জন্য ‘পরশপাথর’ (ইকসীর) এবং দেহের আত্মাস্বরূপ আগমন করলেন। তিনি সৃষ্টির জন্য সত্যের পথকে এমনভাবে উন্মুক্ত ও সহজ করে দিলেন যে, অনাদি ও অনন্তের সমস্ত দূরত্বকে সবার জন্য মাত্র এক কদমের দূরত্বে পরিণত করলেন। (সূত্র : রুহুল বয়ান ফি তাফসীরিল কোরআন কৃত ইমাম ইসমাইল হক্কী র.)
উপসংহারে বলা যায়, উপরিউক্ত কোরআন ও হাদীস শরীফের আলোকে প্রমাণিত যে, রাহমাতুল লিল আলামীন (দঃ) জগতসমূহের প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি রহমত। তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত সত্তাগত রহমত। রাহমাতুল লিল আলামীন (দঃ) এর রহমত লাভে প্রয়োজন তাঁর প্রতি পরিশুদ্ধ ইমান, নিঃশর্ত আনুগত্য, অনুসরণ ও ভালবাসা। জগতবিখ্যাত মরমি কবি আরিফ বিল্লাহ আল্লামা আবদুর রহমান জামী (রঃ) রহমতের প্রত্যাশায় আকুতি জানিয়ে বলেন,
উচ্চারণ : আগারচে গরক-ই দরিয়া-ই গুনাহাম, ফিতাদা খুশ্ক লব বর খাক-ই রাহাম। তু আব্র-ই রহমতী আঁ বিহ কে গাহী, কুনী দর হাল-ই লব খুশ্কাঁ নিগাহী। কাব্যানুবাদ : যদিও আমি ডুবে আছি পাপের সাগরে, শুষ্ক ঠোঁটে পড়ে আছি পথের উপরে। তুমি তো রহমতের মেঘ, করুণার আধার, এই শুষ্ক ঠোঁটওয়ালাদের পানে চাও একবার!
লেখক :
পীরজাদা শাইখ সাইফুল্লাহ ফারুকী চরণদ্বীপি
ইসলামী গবেষক ও প্রাবন্ধিক