
মাইজভান্ডারিয়া তরিকা ও দর্শনের আলোকে বহুত্ববাদী সমাজে সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সিদ্দিকে গাউসুল আযম শেখ অছিয়র রহমান আল ফারুকী আল চরণদ্বীপি (ক.)’ শীর্ষক সেমিনার গত ২১শে আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার চরণদ্বীপ দরবার শরীফে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গাউছিয়া আহমদিয়া রহমানিয়া সংসদ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে বক্তারা সিদ্দিকে গাউসুল আযম শেখ অছিয়র রহমান আল ফারুকী আল চরণদ্বীপি (ক.)-এর জীবন, আধ্যাত্মিক সাধনা, মানবতাবোধ ও দর্শনের আলোকে বহুত্ববাদী সমাজে সাম্য, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরেন। সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইকবাল। তিনি বলেন, মাইজভান্ডারিয়া তরিকার আধ্যাত্মিক দর্শনের মূলকথা হলো আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ও কল্যাণকামী হওয়া। যে হৃদয় আল্লাহর জিকির ও মহব্বতে পরিশুদ্ধ হয়, সে হৃদয়ে হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও বিভেদের স্থান থাকার কথা নয়। তিনি আরও বলেন, সিদ্দিকে গাউসুল আযম শেখ অছিয়র রহমান আল ফারুকী আল চরণদ্বীপি (ক.)-এর জীবন ও দর্শনে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দয়া, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের যে শিক্ষা রয়েছে, তা বহুত্ববাদী সমাজের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্ম, বর্ণ, মত ও পথের ভিন্নতা মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পথে বাধা হওয়া উচিত নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি সম্মান ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে ভিন্নতার মধ্যেও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। “তরিকার প্রকৃত শিক্ষা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে তাকে আল্লাহমুখী এবং সৃষ্টির কল্যাণমুখী করে তোলে।” আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে তাকওয়া, বিনয়, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ জাগ্রত হয়। আর এই নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভেদ কমে গিয়ে সাম্য ও শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আলোচনায় ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী বলেন, সিদ্দিকে গাউসুল আযম শেখ অছিয়র রহমান আল ফারুকী আল চরণদ্বীপি (ক.)-এর আধ্যাত্মিক দর্শনে আল্লাহপ্রেমের পাশাপাশি সৃষ্টির প্রতি মমত্ববোধ ও মানবকল্যাণের শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পথ হলো তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও কল্যাণের মানসিকতা ধারণ করা। এই চেতনা মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে এবং সমাজকে শান্তির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। সুফি সাধনার শিক্ষা মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের পরিবর্তে অন্তরের পবিত্রতা ও নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়। তাই মাইজভান্ডারিয়া দর্শনের মানবিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা বর্তমান সময়ে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। অপর আলোচক অধ্যাপক জহুর উল আলম বলেন, বর্তমান বিশ্বে হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের কারণে মানুষের শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় মাইজভান্ডারিয়া তরিকার মহব্বত, ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা, মানবসেবা ও শান্তির শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি আরো বলেন, সিদ্দিকে গাউসুল আযম শেখ অছিয়র রহমান আল ফারুকী আল চরণদ্বীপি (ক.)-এর জীবন ও দর্শন থেকে মানুষ যদি ভালোবাসা, বিনয়, সহনশীলতা ও পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা গ্রহণ করে, তাহলে সমাজে বিভেদ ও সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হতে পারে। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন শাহসূফী শেখ আবু মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ফারুকী (ম.), সাজ্জাদানশীন, চরণদ্বীপ দরবার শরীফ। সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, মাইজভান্ডারিয়া তরিকার আধ্যাত্মিক সাধনার মূল উদ্দেশ্য হলো অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর মহব্বত অর্জন এবং সেই মহব্বতের আলোকে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দয়া, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ব্যক্তি যদি নিজের অন্তরকে সংশোধন করতে পারে, তাহলে তার আচরণ ও কর্মের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রেও শান্তি ও সম্প্রীতির প্রভাব সৃষ্টি হবে।

পরে সভাপতি শাহসূফী শেখ আবু মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ফারুকী (ম.)-এর পরিচালনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে দেশ ও জাতির কল্যাণ, শান্তি, সমৃদ্ধি, মুসলিম উম্মাহর মঙ্গল এবং সমগ্র মানবজাতির হেদায়েত ও কল্যাণ কামনা করা হয়। সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন হযরতুল আল্লামা শাহজাদা শেখ আবু মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ ফারুকী (ম.), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার নুরুল আবচার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শাহজাদা শেখ আবু মোহাম্মদ সানাউল্লাহ ফারুকী (ম.)। এতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, আইনজীবী, পেশাজীবি, সাংবাদিক ও গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।