
প্রতিবন্ধীরা সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ নয়। সৃষ্টিকর্তার কাছে অপ্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধী উভয় সমান। সৃষ্টিকর্তা একই দৃষ্টিতে তাদের দেখে থাকেন।
আশির দশকের আগে আমাদের বাংলাদেশে ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটি প্রচলিত ছিল না। তখন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মনে করা হতো অক্ষম। ফলে সমাজের লোকজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন নামে সম্বোধন করত। যা শুনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা মানসিক কষ্ট অনুভব করত। শুধু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী (অন্ধ) ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধী হিসেবে গণ্য করা হতো। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কানা, অন্ধ, দৃষ্টিহীন, ট্যারা, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের লেংড়া, খোঁড়া, খঞ্জ, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বোবা, কালা, গোঙ্গা, এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাগল, খ্যাপা, উন্মাদ ইত্যাদি নামে জাতীয়ভাবে সম্বোধন করত। দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে ভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় ডাকা হতো। এসব নামে ডাকার কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পরিবার খুবই কষ্ট পেত। তৎকালীন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে যেসব সংস্থা বা সংগঠন কাজ আরম্ভকরে সেসব সংস্থা বা সংগঠনের নামও ছিল বিভিন্ন। যেমন- বধির সংস্থা, অন্ধ সংস্থা, পঙ্গু পুনর্বাসন কেন্দ্র।
৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলো সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করার কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পর্কে আগের ধ্যান-ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্মানের সঙ্গে সম্বোধনের জন্য দৃষ্টি, শারীরিক, বাক-শ্রবণ, বুদ্ধি এবং বহুমুখী প্রতিবন্ধী হিসেবে নামকরণ হয়। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দায়-দায়িত্ব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৃষ্টি, শারীরিক, বাক-শ্রবণ, বুদ্ধি এবং বহুমুখী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কিন্তু এখনো আমাদের দেশের অনেক পরিবার, সমাজের কিছু মানুষ প্রতিবন্ধী শব্দটি ব্যবহার করছে না। তারা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে কানা, খোঁড়া, লেংড়া, বধির, বোবা ও কালাসহ নানা নামে আখ্যায়িত করে।
এমনকি দেশের বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর মফস্বল সংবাদদাতারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনের ওপর সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের সময় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শব্দের পরিবর্তে অন্ধ, শারীরিক প্রতিবন্ধী শব্দের স্থলে পঙ্গু এবং বাক প্রতিবন্ধী শব্দের স্থলে কালা, শ্রবণ প্রতিবন্ধী শব্দের স্থলে বধির এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শব্দের স্থলে পাগল বা মানসিক রোগী শব্দ ব্যবহার করে। ফলে মফস্বল সংবাদদাতাদের লেখার ওপর ভিত্তি করে অন্ধ, ‘খোঁড়া, পঙ্গু, বোবা, কালা ও মানসিক রোগী শব্দগুলো ব্যবহার করে থাকে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ হিসেবে তাদের রয়েছে মর্যাদা। সেজন্য এ ব্যাপারে সর্বস্তরের মানুষের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট নামে সম্বোধন করার রীতি সমাজে সহজেই প্রচলন ঘটে। বিষয়টি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
লেখকঃ ডা. বরুণ কুমার আচার্য্য।