

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যগতবাহী প্রতিষ্ঠান ক্লিফটন গ্রুপের অন্যতম স্বত্বাধিকারী জনাব জালাল সাহেবের মাধ্যমে আমাদের পুরো পরিবারকে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ গাউসিয়া হক মন্জিলে আমন্ত্রণ জানানো হয় ১৯৯৭ সালের কোন এক সময়। তিনি সম্পর্কে আমার চাচা হন। এটিই ছিল প্রথম আমন্ত্রণ। পরিবারের সবাই এই দাওয়াতে যাওয়ার কথা ছিল প্রস্তুতিও ছিল, কিন্তু সর্বশেষ আমি এবং আমার আম্মা আমরা দুজন দরবার শরিফে যাই। পরিবারের সবার প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কাকতালীয়ভাবে আর কেউ যেতে পারেননি আমাদের সাথে। মনে হয় মহান খোদা তা’য়ালার ইচ্ছা তাই ছিল। আমার পরম সৌভাগ্য। আলহামদুলিল্লাহ্।
তীর্থভূমি দরবার শরিফের দিকে যতই যাচ্ছিলাম মনে হচ্ছিল ততই আমার মন প্রসারিত হচ্ছে খোদা তায়ালার দিকে। দরবার শরিফ পৌঁছানোর পর হক মঞ্জিলের ভিতর বাড়িতে ওযু করে পবিত্রতা অর্জন করার পর মনে হচ্ছিল আমার সারা জীবন একেবারেই পবিত্রতা অর্জন করে নিয়েছে। মন ভীষণ হালকা হয়ে গিয়েছিল। হৃদয়টা শিউরে উঠেছিল। আমার শ্বশুর বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র রওজা পাকে প্রবেশ করে যিয়ারত করতে লাগলাম। মাযারের সুগন্ধি, যিয়ারত কারীদের কান্নার শব্দ, শান্ত পরিবেশ, পাখির পবিত্র কন্ঠে সৃষ্টিকর্তার প্রশংসার ডাক। মাযারের তাসারুফাতে আমার অন্তর মোমের মতো গলে যায়। মন বলেছিল চিরচেনা মহান ব্যক্তির সাথে পুনঃদেখা হতে চলেছে। পরম আত্মা যেন আমাকে ডাকছে। এরই মাঝে মনে পড়ল আমার বাবা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সমাজসেবক মরহুম আলহাজ্জ সেকান্দর হোসেন মিয়া, দাদা ইব্রাহিম মিয়া ও দাদী জাহানারা বেগম এর কথা। কিছু সময়ের
জন্য থমকে গেলাম। নিরব হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। মনে হচ্ছিল এটি আমার বাবার সমাধি। অজান্তেই চোখের কোণে জল ছল ছল করছিলো। উল্লেখ্য আমার বাবা, দাদা, দাদী আল্লাহর মহান অলী বুজুর্গদের ভক্ত ছিলেন।
যিয়ারত শেষ করে আমি আর আমার আম্মা ভিতর বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম আর চারদিকে প্রাণভরে দেখছিলাম। মনোমুগ্ধকর অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। যেন বেহেশতি সুগন্ধি ছড়াচ্ছে। যত দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। আর হৃদয়ে জায়গা করে নিচ্ছিল নিজের অজান্তে। ভিতর বাড়িতে যাওয়ার পর পরিচয় দেওয়াতেই খবর দেওয়া হলো বাড়ির মালিককে। সাথে সাথেই উপস্থিত উম্মুল আশেকীন মুনাওয়ারা বেগম মাইজভাণ্ডারী (রহ.)।
রূপবতী ও মায়াবী চেহারার মহীয়সী এই মহান নারী আমাকে জড়িয়ে ধরে তাঁর পাশে বসালেন। তাঁর কথামালার শব্দচয়নে আছে অন্তহীন গভীরতা। প্রত্যেকটা শব্দে যেন মুক্তা ঝড়ে। মনে হচ্ছিল অনেক পুরোনো পরিচয় আমাদের। আচার-ব্যবহার, কথা-বার্তা,
আতিথেয়তায় আমরা মা-মেয়ে দুজনই যেন তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছি। সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছি সেবিকা, স্বজন, মেহমান কিংবা যিয়ারতকারী মহিলা ভক্তদের সাথে একই শব্দচয়নে, একই স্বরে, একই বাচনভঙ্গিতে কথা বলার দৃশ্য দেখে। মনে হচ্ছিল তিনি যেন আল্লাহ্ প্রদত্ত রাবেয়া বসরি (রহ.)’র মতো বহুগুণের অধিকারী একজন মহান নারী। তাঁর ব্যক্তিত্বে যেন শাহানশাহ্ মাইজভাণ্ডারীর চরিত্র ফুঠে উঠেছে। প্রত্যেকটি মানুষই যেন তাঁকে আপন ভেবে সুখ-দুঃখ সবকিছু তাঁর চরণে অর্পণ করে। সবাই সম্বোধন করে ‘আম্মাজান’ বলে।
তাঁর গুণই বলে দিচ্ছিল এই সম্মান তাঁরই। জীবনে এই প্রথম মনে হয় এমন একজন পবিত্র নারী দেখেছি। বড় আকাঙ্খা ছিল আমিও যদি একটু ‘আম্মাজান’ ডাকতে পারতাম। ঠিক বছর খানেক পরই পরম সৌভাগ্যক্রমে আম্মাজানই হয়েছেন আমার শাশুড়ি আম্মা। আল্লাহ্ আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ্।
তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তান গাউসিয়া হক মনজিল এর সাজ্জাদানশীন আওলাদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী এর সাথে ১৯৯৯ সালে আমার শাদী সম্পন্ন হয়। সেদিন আমি আমার এক মায়ের কাছ থেকে আরেক আপন মায়ের সান্নিধ্যে আসি। মহান স্রষ্টার এই দয়ার শুকরিয়ার অন্ত নেই। আমাকে স্বর্গীয় এক জগতে এনে তিনি ঠাঁই দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ্।
বিয়ের পরই আমার আম্মার সাথে পথ চলা, আর আম্মা হয়ে যান আমার মহান শিক্ষক। শ্রদ্ধেয় আম্মা আমাকে ঘরের বউ হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিতেন। দরবারে আগত মহিলা মেহমানদের আপ্যায়ন, কথা-বার্তা বলা থেকে শুরু করে সন্তান লালন-পালন কিভাবে করতে হবে তা শিখিয়েছেন। কোন মুহূর্তে কি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিতেন। সন্তানকে সুনাগরিক হয়েও হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর আদর্শে জীবন গড়ে তোলার মহান প্রশিক্ষক হচ্ছেন আম্মা। একজন আদর্শবান সন্তান গঠনে আম্মা হচ্ছেন অগণিত নারীর আলোকবর্তিকা।
তিনি আমাকে সব সময় কঠিন সময়ে ধৈর্য্য ধরে আল্লাহর উপর রুজু থাকতে বলতেন। আম্মার সান্নিধ্যে যতদিন ছিলাম, প্রায় প্রতিদিন নতুন কিছু না কিছু শিখেছি। তাঁর কাছ থেকে আমি এমন অনেক কাজ দেখেছি, অনেক আদর্শ শিখেছি, যা আমার চলার পথের পাথেয় হয়ে থাকবে সারা জীবন।বউ হয়ে যখন তাঁদের পরিবারে আমার আগমন ঘটে, স্বাভাবিকভাবে তখন একটা নতুন পরিবেশে, আধ্যাত্মিক জগতের অন্যতম বিশাল পরিবারের নতুন সদস্যদের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়া অত সহজ কাজ ছিলো না। আম্মা আমাকে এই পরিবারের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে অনেক সহযোগিতা করেছেন, একদম বন্ধুর মত আম্মা আমার সাথে মিশে গিয়েছিলেন। তিনি ধীরে ধীরে আমাকে তাঁর
নিজের মত করে গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে দরবারের পরিমণ্ডলের বিশাল এই আধ্যাত্মিক ভূমিতে আমাকে শতভাগ মানিয়ে নিতে আম্মার যে আন্তরিক প্রচেষ্টা তা কখনো ভুলার মত নয়।
আমাকে দরবার বুঝার জন্য, দরবারের মাহাত্ম্য অনুধাবন করার জন্য, দরবারের বিশ্বজনীন যে বার্তা তা একেবারে হাতে কলমে আম্মার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। একটা চিরন্তন সত্য কথা যে আম্মার সান্নিধ্য যদি আমি না পেতাম, তাহলে মহাসাগর রূপী এই পরিমণ্ডলে বিচরণ করা আমার জন্য অনেক কষ্টসাধ্য একটা কাজ হত।আম্মা ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক একজন পরহেজগার মহিলা। নিয়মিত নামায আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, দরূদ শরিফ পাঠ, মিলাদ পড়াসহ অন্যান্য নফল ইবাদতে আম্মা ছিলেন বেশ যত্নশীল। আম্মা একা নয়, তিনি আমাদের সবাইকেই তাঁর খাদেমা মহিলা, নাতি-নাতনিদেরকেও ধর্মীয় আচার পালনে খুব কড়া নির্দেশ দিতেন এবং নিয়মিত দেখভাল করতেন।
আম্মা একটা জিনিস খুব খেয়াল রাখতেন যে, তিনি দরবারের আওলাদের স্ত্রী। তাই আম্মা তাঁর জীবনাচারের প্রতিটি পদক্ষেপে দরবারী আবহ ধরে রাখতেন। দরবারের প্রতি তাঁর এতো বেশি টান ছিলো যে, দরবার ছাড়া এক রাতও বাইরে অবস্থান করতে চাইতেন না। বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে থাকলে তাঁর ধ্যান, জ্ঞান, মন এই দরবারেই পড়ে থাকতো। দরবারের আশে পাশে কোন মাহফিল হলে তিনি রাত জেগে সেই মাহফিল শুনতেন। অনেক সময় মাহফিল শুনে কাঁদতেন।
আম্মা শেষের দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে যাওয়াতে তাঁকে শহরে চিকিৎসার জন্য আনা হতো। চিকিৎসা শেষে আবারো দরবারে নিয়ে আসতে হতো। একটা সময় চিকিৎসার প্রয়োজনে ঘনঘন শহরে আনা নেয়া করাতে আম্মার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আমরা তাঁকে শহরের বাসায় রেখে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাইলে তাতে তিনি চরম আপত্তি জানান। তিনি শহরে থাকতে চাইতেন না। আমাদেরকে জোর করতেন, যেন তাঁকে দরবারে নিয়ে যাই। পরবর্তীতে যখন শহরেই থেকে যেতে হয়েছে, তখন প্রতিদিন আম্মা ভিডিও কলে দরবারের বিভিন্ন কার্যক্রম দেখতেন, আর চোখের পানি ফেলতেন। দরবারকে তিনি অন্তরের গভীরে ঠাঁই দিয়েছেন। আত্মার এই মেলবন্ধন থেকে তিনি ছিন্ন হলেই অনেক অস্থির হয়ে যেতেন।আম্মার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁর কাছে আসা আশেক-ভক্তরা তাঁকে কিছু বলার আগেই অদ্ভুতভাবে বুঝে ফেলতেন। মানুষের মনের কথা বুঝার জন্য একটা সুন্দর মন-মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ হতে হয়। মানুষকে ভালবাসতে হয়, আপন করে নিতে হয়। যে কাজটা আম্মা অত্যন্ত সুন্দর করেই করতে পেরেছেন। মাঝে মধ্যে কোন কারণে আমার মন খারাপ হলে আমি আম্মার সামনে হাসিমুখে স্বাভাবিক বচনভঙ্গী করলেও, তিনি বুঝে যেতেন আমার মন খারাপ। এই সময় আম্মা আমাকে কাছে এনে মাথায় হাত বুলিয়ে মমতাভরা কণ্ঠে সান্ত্বনা দিতেন আর আদর করতেন। মন খারাপ হলেও, আম্মা তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দিতেন না। তিনি আশেক-ভক্তের আম্মা শুধু নন, তিনি ছিলেন অশান্ত অস্থির মনের প্রশান্তির এক নিরাপদ ঠিকানা। আম্মা যখন আমার শ্বশুর শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দরবারে আসেন, তখন থেকে শুরু হয় আম্মার কঠিন পথচলা। কারণ শাহানশাহ্ বাবাজান দুনিয়ার ভাব-বিভোরমুক্ত এক ঐশী মহামানব। যার জন্য তিনি খুব একটা সংসারে মনোযোগ দিতেন না। অথচ
বিশাল একটা পরিবারের বড় বউ হয়ে এক প্রকার একাই সবকিছু সামলাতে হয়েছে আম্মাকে। মঞ্জিল দেখাশোনা, সন্তানদের পড়াশোনা, আশেক-ভক্তদের সুবিধা অসুবিধা দেখভাল করাসহ প্রায় সব কাজ তিনি একাই করে গেছেন। এর মধ্যে শাহানশাহ্ বাবাজানের অস্বাভাবিক আচরণ, বাবাজানের খাবারের ঠিক নেই, ঘুমানোর কোন সময়ের ঠিক ছিলো না, হঠাৎ করেই বাইরে চলে যাওয়া, দিনের পর দিন দরজা বন্ধ করে রুমে অবস্থান করাসহ এই রকম অজস্র সমস্যা, কষ্ট আর ভীষণ রকম চাপ সত্বেও আম্মা তিল পরিমাণ মন খারাপ করতেন না। বরং তিনি এসবকে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব মনে করে ইবাদত হিসেবে হাসিমুখে গ্রহণ করেছেন। আম্মার শ্বশুর এবং শাশুড়ি এই সময় আম্মার পাশে থেকে সান্ত্বনা দিতেন। তিনি তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি থেকে অনেক আদর যত্ন পেয়েছেন। যার জন্য আম্মা তাঁদের উপর বেশি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন এবং সবসময় তাঁদের কথা বলতেন।বাবাজানের অধিক মাত্রায় আধ্যাত্মিক জগতে বিচরণের জন্য বাবাজানকে এক সময় অনেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন বলতে থাকেন। বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুরোধ ও পরামর্শে দাদা হুজুর অছিয়ে গাউসুল আযম হযরত শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) তাঁকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু আম্মা তা মানতেন না এবং বিশ্বাসও করতেন না। তিনি মনেপ্রাণে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে, শাহানশাহ্ বাবাজান আল্লাহ্র মহান অলি। মূল কথা হচ্ছে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আম্মার অন্তরে সেই ঐশী প্রেম দিয়েছেন বলেই, শাহানশাহ্ বাবাজানের ব্যাপারে উচ্চমার্গীয় ধারণা পোষণ করেই তিনি ঈমানী বিশ্বাস নিয়ে বলেছেন, শাহানশাহ্ বাবাজান আল্লাহ্র অলি। আলহামদুলিল্লাহ্।১৯৮৮ সালে বাবাজানের ওফাত এর পর গাউসিয়া হক মন্জিল এর জন্য এক কঠিনতম সময় আসে, তাঁর সন্তানেরা সবাই ছিলেন ছোট, দায়িত্ব নেয়ার মত অবস্থান কারোরই ছিলো না। একজন স্ত্রীর জন্য এর থেকে দুঃসহ কোন স্মৃতি থাকতে পারে না। কিন্তু আম্মা এই পরিস্থিতিতেও দৃঢ় থেকেছেন, ধৈর্য্যের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁর ৬ সন্তানকে দেশের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়িয়ে সুশিক্ষিত ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি ৫ মেয়েকে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য পরিবারে বিয়ে দিয়েছেন। আমার স্বামী হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারীকে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর আদর্শবান সৈনিক হিসেবে তৈরি করেছেন। বাবাজানের রওজা শরিফ নির্মাণের মত ব্যয়বহুল প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন এবং তা সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। আজ এই রওজা শরিফ এশিয়ার অন্যতম স্থাপত্যশিল্প হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। গাউসিয়া হক মন্জিলের আওতাভুক্ত ‘শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) ট্রাস্ট’ এর মাধ্যমে অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মানব উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠান হাজারো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইতোমধ্যে দেশব্যাপি বেশ নাম কুড়িয়েছে। এ মন্জিলে এখন মেহমানদের অবস্থান ও আপ্যায়নের জন্য কত উন্নত ব্যবস্থা।
নারী ও শিশুদের আলাদা অবস্থানের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। রয়েছে বিশাল মাঠ। যেখানে প্রতি জুমাবার হাজার হাজার মুসল্লি জুমার নামায আদায় করেন। আম্মার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর যুগোপযোগী পদক্ষেপ এর জন্য মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন জায়গায় পরিণত হয়েছে গাউসিয়া হক মঞ্জিল। এখানে মানুষ আসে স্বর্গীয় সুধা নিতে, শান্তি অন্বেষণ ও কল্যাণের প্রত্যাশায়। চারিদিক সাজানো এবং গোছানো এই স্থানে আসলেই যে কারো মন জুড়িয়ে যাবে। লক্ষ আশেক ভক্তদের জন্য নিরাপদ ও প্রশান্তির নীড় এই গাউসিয়া হক মঞ্জিল একটা কঠিন সময় পার করে আজকের আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ গাউসিয়া হক মঞ্জিল রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সংগ্রামী এই মহীয়সী নারীর অসামান্য ত্যাগ, দৃঢ়তা আর মেধাশক্তির যথেষ্ট ব্যবহারের মাধ্যমে। তাঁর ৫ মেয়ে আর ১ ছেলের সম্পর্ক এক কথায় অসাধারণ। অনন্য এই সম্পর্ক নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসের কোটা পূরণ হতে আরো বেশ খানিক সময় লেগে যেতো। রাসুলে পাক (দ.) মায়ের সেবাযত্ন করার জন্য যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেই আলোকেই তারা মায়ের সেবা করেছেন। পৃথিবী এক দিকে আর মা এক দিকে। সন্তানরা সবাই সেই মায়ের দিকেই এগিয়ে গিয়েছেন। অনেক সময় দেখেছি, আমার মহান স্বামী হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী দরবারে আগত মেহমানদের সাক্ষাত দিচ্ছেন, তাঁর সাথে সাক্ষাত প্রার্থীদের দীর্ঘ লাইন। এ সময় ভেতর বাড়ী থেকে আম্মাজানের ডাক আসলেই তিনি বসা থেকে সোজা উঠেই আম্মার সাথে দেখা করতে ছুটে আসতেন। আম্মার সামান্য অসুস্থতার কথা শুনলেই শহর থেকে তাঁর মেয়েরা ছুটে আসতো। যেন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) এর মায়ের প্রতি ভালবাসার অনন্য উদাহরণ।একজনকে নিয়ে একটু আলাদাভাবে না বললে এই লিখাটা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। তিনি হচ্ছেন আম্মার একমাত্র পুত্র সন্তান, মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ গাউসিয়া হক মঞ্জিলের সম্মানিত সাজ্জাদানশীন ও মধ্যমণি, লক্ষ আশেকের প্রাণস্পন্দন, আমাদের পবিত্রতম অহংকার, আমার মহান স্বামী আলহাজ হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী। আম্মা আর আমার স্বামী তাদের মা সন্তানের সম্পর্ক হযরত মা ফাতিমা (রা.) আর তাঁর আদরের দুই দুলারা হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আদর্শের প্রতিচ্ছবি। এরা যেন একে অপরের পরিপূরক ও পরমাত্মা। দুইটা দেহে একটা প্রাণ। মায়ের কিছু হলে ছেলে অস্থির আবার ছেলের কিছু হলে মা অস্থির। শত ব্যস্ততা, কাজের চাপ যা থাকুক না কেন, মা-ছেলের ভালবাসা, যত্ন নেয়া, সার্বক্ষণিক পাশে থাকা, কিছুই বাধা হতো না। আম্মা বিশেষ যত্নে শাহানশাহ্ বাবাজানের রেখে যাওয়া রক্তের উত্তরাধিকার ও পবিত্র আমানতকে গড়ে তুলেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে নাম করা স্কুল কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। আম্মার কাছে আদর্শিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ছিল মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার স্বরূপ উন্মোচক, অছিয়ে গাউসুল আযম হযরত শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)।আম্মা সব সময় দাদা হুজুরের আদর্শ ও কর্ম অনুসরণ করতেন। তিনি চেয়েছেন যেন তাঁর পুত্রও দাদা হুজুরের আদর্শ অনুসরণ করে জীবন গড়েন। সেই লক্ষ্যে আম্মা তাঁর পুত্রকে সব সময় নির্দেশ দিতেন দাদা হুজুরের কাজকে অনুসরন করে চলতে। আজ আম্মার স্বপ্ন পূরণ করেছেন তাঁর সন্তান। সারা বিশ্বের অন্যতম রোল মডেল হিসেবে আজ আম্মার গর্বিত সন্তানের বেশ খ্যাতি রয়েছে। তাঁকে তিলে তিলে প্রতিষ্ঠিত করতে মায়ের ঘামঝড়া পরিশ্রম, ত্যাগ আর মূল্যবান সময় ব্যয়, আজকের মা জাতির কাছে অনুকরণীয় আদর্শ আর প্রেরণা হয়ে থাকবে। আম্মার গড়ে তোলা এই মানুষটি আজ লক্ষ আশেকের ভালবাসার পাত্র। তিনি ‘শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) ট্রাস্ট’এর মত মানবিক প্রতিষ্ঠান করেছেন। যার কর্মে-আদর্শে ক্রমেই ফুটে উঠছে হযরত গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র বিশ্বজনীন ত্বরিকার নির্যাস। যিনি তাঁর দৈনন্দিন কাজের সূচিতে রাখেন মানুষের কল্যাণমুখী নানা কর্মসূচি। আড়ালে থেকে কোটি কোটি টাকা এই ট্রাস্ট এর মাধ্যমে বিলিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর কল্যাণমুখী এই কর্মসূচি থেকে উপকৃত হয়েছে জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণী পেশার মানুষ। গাউসিয়া হক মঞ্জিলের যেকোন ছোট-বড় সিদ্ধান্ত আম্মার সাথে পরামর্শ করে নিতেন। রওজা শরিফের মার্বেল পাথর কোন ডিজাইনের হবে, ফ্যানের কালার কি হবে, দেয়ালের রংয়ের কালার কি হবে, কি গাছ লাগালে সুন্দর হবে ইত্যাদি সিদ্ধান্তই আম্মার সাথে বসে করতেন। পরিপাটি সুন্দর মনোমুগ্ধকর গাউসিয়া হক মঞ্জিলের প্রতিটি ইট নির্বাচনে ছিলো মায়ের মতামত।
দাদী-নানী হিসেবে আম্মা ছিলেন অতুলনীয়। তাঁর মেয়ের ঘরের হোক বা ছেলের ঘরের নাতি-নাতনি কেউ তাঁর কাছে আলাদা ছিলো না। সবাইকে সমানভাবে স্নেহ করতেন। নাতি-নাতনিদের ছাড়া আম্মা খাবার গ্রহণ করতেন না। আমার সন্তানরা যখন শহরে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, তখন আম্মা নিয়মিত ফোন করতেন, ভিডিও কলে কথা বলতেন। নাতি-নাতনিদের সাথে সবসময় যোগাযোগ রাখতেন। তাদের ভালমন্দ খবর রাখতেন। আমাকে বিশেষভাবে নির্দেশ দিতেন যেন তাদের যত্নের কোন কমতি না হয়। ছোটবেলা থেকেই নাতি-নাতনিদের প্রতি আম্মা এতোবেশি যত্নশীল ছিলেন যে, আমাদের এটা নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা করতে হতো না। আর তাঁর প্রতিটা নাতি-নাতনি তাঁকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। দূরে কোথাও থেকে আসলে দৌড়ে আম্মার বুকের উপর ঝাপ দিতেন। এ সময় একে অপরের মাঝে এমন একটা পরিবেশ বিরাজ করতো যে, মনে হতো কত বছর পর তাদের দেখা হয়েছে। হৃদ্যতাপূর্ণ এই সম্পর্ক যেন হযরত ইমাম হাসান-হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) ও রাসুলে পাক (দ.) এর নানা-নাতির পবিত্র সম্পর্ককে মনে করিয়ে দেয়। তিনি আত্মীয়-স্বজনের প্রতি আন্তরিক ছিলেন। বিশেষ করে তাঁর শ্বশুর বাড়ির শাহানশাহ্ বাবাজানের ভাই-বোন, তাদের স্ত্রী সন্তানদের সাথে ছিলো দারুণ সু-সম্পর্ক। গাউসিয়া হক মঞ্জিলের কোন অনুষ্ঠানাদি পালন করা হলে বা পারিবারিক কোন অনুষ্ঠান হলে সবার আগে তাঁদেরকে অগ্রাধিকার দিতেন। ভেতর বাড়িতে তাঁর শ্বশুর বাড়ি থেকে কেউ আসলে, আম্মার মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত, আন্তরিকভাবে সবার সাথে কথা বলতেন, আদর আপ্যায়নে তিনি সবসময় একটু বেশিই যত্নবান থাকতেন। মেহমানরা যতক্ষণ অবস্থান করতো, ততক্ষণ তাদের সাথে খুব হাসি-খুশিতে কথা বলতেন, সময় দিতেন। তাঁর একটা রেওয়াজ হচ্ছে, বছরের দুই ঈদে অবশ্যই দাদাবাড়ি, চাচাদের বাড়ি সবাইকে যেতে হবে। আমরাও খুব আনন্দ সহকারে আমার চাচা শ্বশুরদেরকে ঈদের সালাম করতে যেতাম। এই কাজটা তিনি প্রতি বছর ঈদের দিনই করতেন। যত ব্যস্ত থাকি না কেন, ওখানে আমাদেরকে যেতেই হতো। আত্মীয় স্বজনের মধ্যে অনেক পরিবার আছে, যারা নিঃস্ব-অসহায় আম্মা তাদের ব্যাপারে বিশেষ করে খবর রাখতেন। আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বিবাহযোগ্য কন্যার বিবাহ দেয়া, অসুস্থ হলে ঔষধপত্র ক্রয়ে অর্থ সহায়তা দেয়া, লেখাপড়া করার জন্য অর্থ সহায়তা দেয়া, এইরকম অনেক কাজ তিনি গোপনে করতেন। পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে আম্মা সবসময় ভাল ব্যবহার করতেন। তিনি কোন প্রতিনিধি মারফত প্রতিবেশীদের খবরাখবর নিতেন। নিজেদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে তিনি প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানাতেন। এলাকার অসহায় পরিবারের মাঝে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সহায়তা দিতেন। আবার কোন পরিবারের ছোট মেয়েদের নিজের কাছে এনে বড় করে উপযুক্ত পাত্র দেখে বিয়েও দিয়েছেন। আশেক ভক্ত জায়েরীনদের জন্য আম্মা ছিলেন পবিত্র আত্মার আত্মীয়। দরবারের বাৎসরিক উরস অনুষ্ঠানে আগত মহিলা মেহমান জায়েরীনদের জন্য সবসময় তৎপর থাকতেন। তাদের অবস্থান, খাওয়া-দাওয়া-সুযোগ সুবিধার দিকে বেশ নজর রাখতেন আম্মা। দূর দুরান্ত থেকে আসা মেহমানদের জন্য বিশেষভাবে সুযোগ সুবিধা দিতেন। আম্মা সকল আশেকানদের সাথে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে কথা বলতেন। তাদের সবার সাথে ধৈর্য্য সহকারে সাক্ষাত করতেন। আম্মা সকল আশেকানদের কথা শুনতেন। অনেক আশেকান অসহায়ভাবে আম্মাকে তাদের কষ্টের কথা উপস্থাপন করতেন। আম্মা তাদের কথা শুনে খুব আফসোস করতেন। যখন কারো কষ্টের কথা শুনতেন সাথে সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের কাছে রক্ষিত টাকা তিনি দিয়ে দিতেন। তিনি গরীব অসহায় আশেক ভক্তদের কি পরিমাণ টাকা দান করতেন তার কোন হিসেব রাখতেন না। আম্মার সাথে মানুষ এমনভাবে সব কথা বিনিময় করতেন, নিজের আপন কোন মানুষের সাথেও এভাবে কেউ মনের গোপন কথা বলে না। অনেক সময় তাঁর সন্তানের (আমার স্বামী) সাথে মহিলারা সাক্ষাত চাইলে আম্মার অনুরোধে তাদেরকে তিনি সাক্ষাত দিতেন। আশেক ভক্তের কোন আবদার তিনি ফেলতেন না। সারাক্ষণ আশেক ভক্তদের সেবাযত্ন নিয়েই আম্মা তাঁর সময় অতিবাহিত করতেন। ভেতর বাড়িতে মেহমান, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, আশেক ভক্ত দেখলেই তিনি আনন্দিত হতেন। চোখে মুখে উচ্ছ্বাস এর ছাপ লক্ষ্য করা যেতো। রাসুলে পাক (দ.) এর অন্যতম পছন্দনীয় আমল ছিলো মেহমানদারী করা। আলহামদুলিল্লাহ্।
এতিমদের আম্মা নিজের সন্তানের মত ভালবাসতেন। তাঁর নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘উম্মুল আশেকীন মুনাওয়ারা বেগম এতিমখানা ও হিফযখানা’র ছাত্রদের জন্য ভেতরবাড়ি থেকে উন্নতমানের খাবার পাঠাতেন। কোন এতিম ছাত্রের সঙ্গে আম্মার সাক্ষাৎ হলেই তাদেরকে তিনি অনেক আদর করতেন এবং খাবার খাওয়াতেন। এ ছাড়াও দরবারের বাৎসরিক অনুষ্ঠানাদিতে তাদের জন্য আলাদা করে সবকিছু ব্যবস্থা করে রাখতেন। এতিমদের সব বিষয়ে সার্বিক খোঁজখবর রাখতেন। মহান আল্লাহ্ বলেন “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে ও কোন কিছুকে তাঁর সাথে শরিক করবে না। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, অহংকারীকে (নিসা ৪/৩৬)”। ইসলাম ধর্মের শাশ্বত জীবন ব্যবস্থার আলোকেই আম্মা নিজেকে গড়ে তুলেছেন। উপরোক্ত কথা আর কুরআনের আয়াতই হচ্ছে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আম্মার অন্যতম লক্ষ্য ছিলো মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার প্রচার যেন বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়ে। সে লক্ষ্যেই আম্মা তাঁর সন্তানের সাথে কাজ করেছেন। মাইজভাণ্ডারী একাডেমি প্রতিষ্ঠা, গবেষণা ও প্রকাশনা সেল গঠন, বই প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামসহ ট্রাস্ট এর নানান কর্মসূচিতে ছিলো আম্মার প্রচ্ছন্ন ভূমিকা। তাঁর সুফলও ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে সমগ্র বিশ্ব। আজ এ ত্ববিকার প্রচার-প্রসার বিশ্বব্যাপি হচ্ছে। সারা বিশ্বে এ ত্বরিকার অগণিত আশেক ভক্ত সৃষ্টি হচ্ছে। বহির্বিশ্বে শাহানশাহ্ বাবাজানের অনেক আশেক ছড়িয়ে পড়েছে।
আম্মা শুধু একজন দরবারি পুত্রবধূ বা শুধু দরবারের বিষয় জানেন তা কিন্তু না। তিনি দেশের সব বিষয় ও রাজনৈতিক খবরসহ বিশ্বের বিভিন্ন খবরা-খবর রাখতেন। নিয়মিত পত্রিকা পড়তেন। এক কথায় সব ব্যাপারে তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন। আম্মা গ্রামে বেড়ে উঠলেও শহরের আধুনিকতার ব্যাপারে তিনি অনেক এগিয়ে ছিলেন। আম্মা খুব ভ্রমণপিয়াসী ছিলেন, সময় পেলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণে যেতেন। আমাকে ওমরা হজে নিয়ে গেছেন, সেখানে মক্কা, মদিনা জিয়ারত করেছেন, এ ছাড়াও চিকিৎসার জন্য ব্যাংককও ভ্রমণ করেছেন।মিয়ানমারের বিখ্যাত সব দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করেছেন। এছাড়াও তিনি দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পট যেমন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, বান্দরবান, রাঙ্গামাটিসহ দেশের প্রায় জায়গায় ভ্রমণ করেছেন। আম্মা টিভি সেটের সামনে বসে জিওগ্রাফী চ্যানেলে, বিভিন্ন বন, জঙ্গল, পশু পাখি, নদী বন্দর, আকাশ, সমুদ্রের জলরাশির দৃশ্য দেখতেন, আর আমাদের বলতেন, দেখো আল্লাহর সৃষ্টি কত সুন্দর, কত অপরূপ। সুবহান আল্লাহ্।আম্মার গুণাবলীর ব্যাপ্তিটা এতো বিশাল যে, তা সামান্য এই প্রবন্ধে লিপিবদ্ধ করা কোনভাবে সম্ভব নয়। আমার অনুভূতি এমন গুণবতী নারী আমি জীবনেও দেখিনি। আমাদের পরম প্রিয় এই মানুষটি বিধাতার নিয়মেই ধীরে ধীরে আল্লাহর দিকেই ধাবিত হয়েছেন যে তার কোন আন্দাজই আমরা করতে পারিনি।
আম্মা যখন অসুস্থ হয়ে গেলেন, শেষ সময় হাসপাতালেই থাকতে হয়েছে। অসুস্থতার দরুন আম্মার স্মৃতিশক্তি সীমিত হতে থাকে। তিনি কাউকে ভাল করে চিনতে পারছিলেন না। কিন্তু কি আশ্চর্য, তাঁর সন্তান যখনই তাঁর সামনে উপস্থিত হতেন বা ওষুধ খেতে বলতেন, তিনি ওষুধ খেতেন আর তাঁর দিকে মায়ার নজরে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলতেন, এইতো আমার ছেলে, আমার বুকের ধন, আমার বাবাজান। আম্মা হাসপাতালের বেডে সবসময় বলতেন ‘এই আমার শ্বশুর (দাদা হুজুর) এসেছেন তাঁকে বসতে দাও’ ‘এই দেখো জেবুর (বড় আপা) বাবা এসেছেন (শাহানশাহ্ বাবাজান) তাঁকে বসতে দাও, চা দাও’ ‘আমার আব্বা-আম্মা আসছে। এই সময় আম্মা বলতেন, আমার হাসান কই’ ওকে ডাকো, বসতে বলো, সবাইকে চা নাস্তা দাও’ সহ নানানরকম কথা বলতেন আর জিকির করতেন। তিনি অসুস্থতায় যখন খুব অস্থির হতেন, তখন কেউ তাঁকে থামাতে পারতো না। ডাক্তার, নার্স এবং আমরা সবাই তাঁকে থামাতে ব্যর্থ হতাম। তখন আম্মাকে দরবারে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেই তিনি শান্ত হয়ে খাবার-দাবার-ঔষধ খেয়ে নিতেন। অনেক সময় তাঁর ছেলে উপস্থিত হলেই তিনি থেমে যেতেন। আর মায়ার নজরে তাকিয়ে থাকতেন। ‘ও পুত’ বলে আদরী কণ্ঠে কাছে ডাকতেন। এই সময় আম্মা তাঁর ছেলের সকল অনুরোধ অকপটে রাখতেন। কোনরকম অস্বাভাবিক আচরণ করতেন না।আম্মাকে বলতে শুনেছি শাহানশাহ্ বাবাজান আমার জন্য অপেক্ষা করছেন, আমাকে ডাকছেন তিনি। তাঁর ছেলেকে বলতেন ‘ও পুত। আমি আর বাঁচবো না’। ভাবা যায়, এই সময় একজন ছেলের মনের অবস্থা কি হতে পারে? তারপরেও আম্মাকে তিনি বলতেন, আম্মা কিচ্ছু হবে না, ভাল হয়ে যাবেন। মায়ের এমন অন্তিম সময়ে কতটা কষ্ট বুকে চাপা দিয়ে একজন সন্তানকে এমন সান্ত্বনাসুলভ কথা বলতে হয়, তা চোখে না দেখলে বুঝতে পারতাম না।
আমরা আবেগের জাতি, ভালোবাসার জাতি। ভালোবাসা ও হৃদ্যতায় জমে থাকা জীবন যখন একটি সময়ের শেষ বিন্দুতে থমকে দাঁড়ায় তখন অশ্রুসিক্ত আবেগময় বিদায় জানানো আমাদের তথা মানবজাতির চিরচেনা সংস্কৃতি। মানুষের জীবন নাতিদীর্ঘ। এ স্বল্প জীবনের নানা প্রবাহে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় আরো অন্যান্য জীবন এবং প্রতিটা সম্পৃক্ততায় সৃষ্টি হয় আবেগ ও ভালোবাসাময় স্মৃতির। এ স্মৃতির টানেই মানুষ কষ্ট পায় প্রিয়জনের হঠাৎ প্রস্থানে কিংবা অকাল প্রয়াণে, হৃদয়ের আঘাতে ক্রন্দনসিক্ত হয়। মানুষের প্রতি প্রিয়জনের এ টান, এ ভালোবাসা চিরায়ত ও শাশ্বত। তাই তো মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রিয়জন হারানোর শোকে। যে গৃহে কোনো মানুষ বিদায় নেয়, সে গৃহে নেমে আসে শোকের মাতম, আহাজারি আর গগনবিদারী আর্তচিৎকার। মৃত্যু অবধারিত, একদিন মৃত্যুর করাল গ্রাস সবাইকেই গ্রাস করবে এতে কেনো সন্দেহ নেই এবং এ থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। এটা মহান রাব্বুল আলামিন-এর একটা শাশ্বত চিরায়ত নিয়ম। কিন্তু কিছু প্রিয় মানুষের বিদায় সত্যি বড়ই বেদনাদায়ক।খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর পর মায়ের কাছেই বড় হওয়া। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক যে, বিয়ের পর শ্বশুর আব্বাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আপন গৃহ ছেড়ে মায়ের কাছ থেকে অন্য গৃহে এসে আর একজন মায়ের সাথে আমি স্বর্ণালী দিন পার করছিলাম। কিন্তু হায়! সেই মাও বিদায় নিলেন। মুহূর্তেই এক আলোকিত পরিবেশে নেমে এলো নিকষ কালো অন্ধকার।
গাউসিয়া হক মঞ্জিলের পরম প্রিয় অভিভাবক লক্ষ আশেকানদের রুহানী ‘আম্মাজান’ উম্মুল আশেকীন হযরত মুনওয়ারা বেগম (রহ.)’র পদধুলির অভাবে ভেতর বাড় এখন কাঁদছে। পিনপতন নীরবতার এই পরিবেশ আবার কবে ফিরে পাবে তার আপন ঔজ্জ্বল্যতা সেটা মহান মুনিবই ভালো জানেন। সেই মুনিবের দরবারে ফরিয়াদ!! আম্মার শিখিয়ে দেয়া আদর্শে যেন এই আঙ্গিনাকে আবারো পুরনো রূপে ফিরিয়ে আনতে পারি।
আমিন।
সৈয়দা জেসমিন হাসান
উম্মুল আশেকীন-এর পুত্রবধূ।