[গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]
মানবসভ্যতা বিকাশের মানবেতিহাসে বিপন্ন, বিভ্রান্ত দিকভ্রান্ত সময়ে যুগে যুগে বহু মনীষি, অসংখ্য মহাত্মা মানবমুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। পতনোন্মুখ মানবজাতিকে বাতলে দিয়েছেন শাশ্বত সুন্দর, সত্য ও কল্যাণের পথ। তাঁদের মধ্যে সুফি-দরবেশদের অধ্যাত্মবাদী জীবন ও সাধনা, তাঁদের উদার-মানবিক ,সম্প্রীতিপূর্ণ ও ভ্রাতৃত্ববোধে উচ্চকিত জীবনাচার সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর রেখাপাত করেছে। বিশেষ করে এই উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার-প্রসারে সুফিবাদী প্রেরণা ও প্রভাব সর্বজনবিদিত। সুফিবাদ মূলত প্রেম ও আত্মশুদ্ধির সাধনা। প্রেম এমন এক আশ্চর্য মহৌষধ— যার জাদুকরী স্পর্শে মানবাত্মা কলুষমুক্ত হয়। সুফিবাদে প্রেমই সারকথা। কেননা সকল সৃষ্টি প্রেমজ অর্থাৎ প্রেম থেকে জাত। দয়াময় স্রষ্টা মহাপবিত্র। মহান স্রষ্টা পবিত্র প্রেমাবেগে মানুষসহ সমগ্র সৃষ্টিকূল সৃজন করলেন। ফলে প্রেম এক পবিত্রতম অনুভূতির নাম। অন্যভাবে বলা যায়— প্রেম এক আনন্দময় অনুভব-অনুভূতি। সুফিবাদে প্রেমের সাধনাতেই পরম স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছানো যায়। প্রেমই একমাত্র মিলনসেতু আশেক-মাশুকের তত্ত্বগত পারস্পরিক সম্পর্কে। সুফিদের উদার-অসাম্প্রদায়িক, নির্লোভ-নিরহংকার জীবনধারা, তাঁদের ব্যক্তিত্ব ও বিশুদ্ধ-নির্মল জীবন মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁদের উন্নতও মহৎ জীবনচরিত সহজেই জয় করে নিয়েছে সাধারণ মানুষের হৃদয়। আমাদের এই বাংলায়ও এসেছেন তেমনি অনন্য অনেক মহাপুরুষ। কালক্রমে সেই সব মহৎপ্রাণ সুফি-দরবেশদের কারও কারও বংশধারা এখনও সেই গৌরবময় অধ্যাত্মবাদী সাধনপন্থা ও পূর্ণ মানবতা নিয়ে আমাদের সমাজে পারমার্থিকতা, আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণমুখী কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বময় যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি, ধর্মে ধর্মে বিবাদ, জাতিতে জাতিতে বিবাদ ও মানবতার সামগ্রিক পতনকালে এই সুফিবাদের ধারক ও সাধকেরা শুভবোধের আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল সুফি-সাধনার এক অসামান্য উর্বর ভূমি। সুফি-সাধক হযরত শেখ সাচী মুহাম্মদ নক্শবন্দি (রহ.) (১৬৮৬-১৭৮০)একজন মহান সুফিসাধক। ইসলামের ইতিহাসে সিদ্দিকে আকবর খ্যাত আরবের সম্ভ্রান্ত কোরাইশ বংশজাত ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং অন্যদিকে খ্যাতিমান সুফি-সাধক মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির (র.) রক্তধারা হতে উদ্ভূত এই সুফিসাধকদের পূর্বপুরুষ এই বাংলাদেশে এসেছেন। আরাকান রাজসভার কবি কোরেশী মাগন ঠাকুরও এই পরিবারের পূর্বপুরুষ। এই পরিবারের সবচেয়ে জ্যোতির্ময় সাধককবি ও আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ আলী রজা ওরফে কানু ফকির (১৭৬০-১৮৩৮)। তাঁরই পিতা হলেন— হযরত সাচী মুহাম্মদ নক্শবন্দি (রহ.)। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় এই মহান সাধকের মূল সাধনক্ষেত্র হলেও বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনমার্গের বিকাশে ও সাম্য, ভাতৃত্ব ও মানবতার বিকাশে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসুরীগণ নানাভাবে নানা জায়গায় মানুষের ঐহিক ও পারমার্র্থিক হিতসাধনে অনন্য ভূমিকা পালন করে চলেছেন। এই নক্শবন্দিয়া ত্বরিকার সাধকেরা বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চার শত বছর ধরে আধ্যাত্মিক সুফি-চর্চা ও মানবতার প্রবহমানতা বজায় রেখে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে, বিশেষ করে মধ্যযুগের ইতিহাস পাঠ করলে এই পরিবারের অতীত ঐতিহ্য ও গৌরবগাঁথা সহজেই অনুমান করা যায়। কক্সবাজারে এখনো এই সুফি-সাধকের স্মৃতিবিজড়িত ও তাঁর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী ও দৃষ্টিনন্দন সাচী মসজিদ বিদ্যমান, যা ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে নিজ ধর্ম ও সাধনার প্রসারে তৈরি করেছিলেন। আগেই বলেছি — এই পরিবারের আধ্যাত্মিকতা পরম্পরা বাহিত; এই মহান সাধকদের রয়েছে উজ্জ্বল সাধন-জীবন ও কারামত। তাঁদের প্রত্যেকেরই রয়েছে অগণিত ভক্ত-শিষ্য-মুরিদ। সুফিবাদী সাধনার ধারায় এই সাধক-পরিবারে বেশ ক’জন অত্যন্ত মহাত্মা ও বড়োমাপের ওলি-দরবেশ রয়েছেন। কিন্তু মন মুগ্ধকর বিষয় হলো— এই পরিবারের প্রায় সকলেই আধ্যাত্মিক সাধন-ভজনার পাশাপাশি সাহিত্যিক ও সংগীতস্রষ্টাও। অসংখ্য সাধন-সংগীত এবং সাহিত্যও সৃষ্টি করেছেন এই সুফি-দরবেশগণ। বাংলাদেশের সুফি-ফকিরি সাধনায় আলী রজা কানু ফকির এক অসামান্য ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কালগত দিক থেকে তিনি লালন সাঁইয়েরও পূর্ববর্তী সাধক হিসেবে পরিগণিত। সিরাজ কুলুব, ধ্যানমালা, যোগকলন্দর, ষট্চক্রভেদ, জ্ঞানসাগর আলী রজা কানু ফকিরের বিখ্যাত গ্রন্থ। তিনি মধুরামী লিপিতে বাংলা লিখতেন। আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ তাঁর জ্ঞানসাগর-এর আগম অধ্যায়টি আধুনিক বাংলায় রূপান্তর ও সম্পাদনা করেছিলেন। এই জ্ঞানসাগর গ্রন্থ নিয়ে সম্প্রতি ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মলয় দেব ও পদ্মকুমারী চাকমা উচ্চতর গবেষণা-কর্ম সম্পাদন করেছেন। আরবি-ফারসি ভাষায় রচিত তাঁর অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে। হযরত খাজা দরবেশ মাওলা (রহ.) (১৯৪২-২০১১) এই বংশধারার আরেকজন অতি উঁচুমাপের সুফিসাধক এবং অধ্যাত্মবাদী সাহিত্য ও সংগীত-স্রষ্টা। তিনি আলী রজা কানু ফকিরের রক্তধারার ৫ম পুরুষ। সারাদেশেই তাঁর অসংখ্য ভক্ত-শিষ্য, ভাবশিষ্য রয়েছে। কানুবাবার পরিচিতি, সিদ্ধা তরত্ রত্নমালা, জুয্য়ুন্ নুর, হুশিয়ার, রাহে নুরাইন ফি মিনহাজুল মুরিদাইন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ অসাধারণ সব অধ্যাত্মবাদী সাধনতত্ত্ব, সাহিত্য-সংগীতের রত্নভান্ডার যেন এই সাধককূলের সৃজনভূমি! সৃষ্টিতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতা ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের কত উপায়— নিগুঢ় কথা বর্ণিত হয়েছে এসব মহামূল্যবান গ্রন্থরাজিতে। কত অজানা জ্ঞান-প্রজ্ঞা, তত্ত্ব-দর্শন, সাধনসূত্র-সংগীত লহরীর এক নান্দনিক ভাবসাধনজগত সুপ্ত রয়েছে এখানে! অনুসন্ধানী পাঠক-রসজ্ঞ, জ্ঞানান্বেষীও আশেকজনের কাছে এই সাহিত্য-সংগীত ও আধ্যাত্মিকতা হতে পারে এক স্নিগ্ধ সরোবর। যেখানে অনায়াসেই তৃপ্ত হবে মানবাত্মার অসীম পিপাসা। সাধকদের এসব গ্রন্থাবলি বাংলায় অনূদিত হলে বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও বাঙালি সমাজেতিহাসের এক অনালোকিত সমৃদ্ধ অধ্যায়ের দ্বার উন্মোচিত হবে। এই মহান সাধকের প্রধান খানকাহ্ ও দরবার শরীফ চট্টগ্রামের আনোয়ারার ওষখাইন গ্রামে অবস্থিত। চট্টগ্রাম শহরস্থ রুবি গেইট এলাকায়ও রয়েছে হযরত খাজা দরবেশ মাওলা (রহ.) পবিত্র রওজা মুবারক এবং ওষখাইনীরি নূরীয়া বিষু দরবার শরীফ। আনোয়ারায় এবং রুবি গেইটস্থ দরবারে ও খানকাহ্তে এই ত্বরিকার অধ্যাত্মবাদী সাধনা ও মানবতা অর্জনের চর্চা চলমান রয়েছে। দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত-মুরিদের আনাগোনায় প্রায় সারা বছরই ঐশী ভাব-পরিমন্ডল বিরাজ করে এই সাধনতীর্থে। হযরত খাজা দরবেশ মাওলা (রহ.) এঁর সুযোগ্য জ্যৈষ্ঠপুত্র হযরত মাওলানা মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন নুরী আল কুরাইশী বর্তমানে এই দরবারের মনোনীত সাজ্জাদানশীন। সমকালীন বাংলাদেশে তাসাউফ-চর্চার জগতে তিনি অত্যন্ত বিদ্বান, জ্ঞানী এবং প্রজ্ঞাবান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত। তাঁর অসংখ্য ভক্ত-মুরিদ ও অনুসারী রয়েছে। তিনি বহুদর্শী এবং বহুভাষাবিদ। বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, ফারসি, উর্দু প্রভৃতি ভাষায় তাঁর পাণ্ডিত্য রয়েছে। ফলে তিনি তাঁর সাধক পিতা-পিতামহসহ সকল পূর্বপুরুষের অন্যান্য ভাষায় রচিত মহামূল্যবান গ্রন্থ-কিতাবসমূহ আধুনিক বাংলায় রূপান্তর ও সম্পাদনার কাজ শুরু করেছেন। এই দুরূহ কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি জাতিগত ইতিহাস-ঐতিহ্য ও দেশজ সাধন-ভজনার পরম্পরাগত ধারা সম্পর্কেও বিশদভাবে জানতে পারবে উত্তরপ্রজন্ম। আমাদের জাতির জ্ঞানতাত্ত্বিক জগতেও যুক্ত হবে নতুন নতুন জ্ঞান ও প্রজ্ঞাময় দীপ্তি। শিষ্যদের আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ এবং আধ্যাত্মিকতা হাসিলের জন্য তাঁর খানকাহ্তে নিয়মিত পাঠদান তথা স্কুলিং এর ব্যবস্থা চালু রেখেছেন। মানবকল্যাণব্রতী এই সাধক ভালো মূল্যবোধসম্পন্ন পরিশুদ্ধ মানুষ তৈরির জন্য তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। মানবসেবায় তিনি চিকিৎসাক্যাম্পের পরিচালনার মাধ্যমে দুঃস্থও বিপন্ন মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন। মানবকল্যাণে তিনি আরও নানামাত্রিক কাজ করে চলেছেন। সুফি গবেষণার প্রচার ও বিকাশে চালু করছেন রিসার্চ সেন্টার।সম্প্রতিক তাঁর প্রচেষ্ঠায় বাংলাদেশ ও ভারতের অসংখ্য জ্ঞানী গুণিদের সহযোগিতা ও পরামর্শে এই মহান নক্শবন্দি সুফি সাধকদের জীবন নিয়ে এক দুর্লভ গ্রন্থ নক্ষত্ররাজির অস্তাচল প্রকাশ পেয়েছে আধ্যাত্মিক ও সাধন-সংগীত রচনায় দারুণ উৎকর্ষ রয়েছে এই সাধকের। তিনি বিভিন্ন ভাষায় (বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু) এ যাবৎ প্রায় তিন হাজারেরও অধিক ভাবগান ও সাধনগান রচনা করেছেন। ১৩ই জানুয়ারী ২৯ই পৌষ রোজ মঙ্গলবার এই আধ্যাত্মিক আলী নগর প্রাণপুরুষ সুফি-সাধক হযরত শেখ সাচী মুহাম্মদ আল নকশবন্দি (রহ.) এঁর পবিত্র ওরশ মুবারক। গাউছিয়া রহমানিয়া মাওলা মঞ্জিলে অত্যান্ত ভাব গম্ভিরের সাথে উদ্যাপন। এই মহান সাধকের জীবন ও কর্ম এবং বংশ-ধারার সাধকগণ যুগ যুগ ধরে যুগ-যন্ত্রনাক্লিষ্ট ও বিভ্রান্ত-বিপথগামী মানুষকে মুক্তির দিশারি হয়ে পথ দেখাবে। তাঁদের দেখানো সাধনপথেই মানুষ পাবে আধ্যাত্মিক ও ইহজাগতিক পূর্ণ মানবতা ও অভীষ্ট পথ।