শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালি সনাতনী সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে আনন্দময় ধর্মীয় উৎসব। আশ্বিন বা কার্তিক মাসে দেবীর এই আবাহনকে কেন্দ্র করে সমগ্র বাংলা মেতে ওঠে এক অনাবিল উৎসবে। মহালয়া দিয়ে যে দেবীপক্ষের সূচনা হয়, তার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। দুর্গা পূজা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় এই উৎসব। মহালয়ার আনন্দধ্বনি দিয়ে যার শুরু, দশমীর অশ্রুসজল বিদায়ে তার সমাপ্তি ঘটলেও, এই পূজা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির হৃদয়ে রেখে যায় সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক চিরন্তন বার্তা।
মহালয়া থেকে শুরু করে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিটি দিনের রয়েছে আলাদা তাৎপর্য ও আচার-অনুষ্ঠান।
মহালয়া (দেবীপক্ষের সূচনা) হলো দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনালগ্ন। এই দিন অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এই দিনে দেবী দুর্গা কৈলাস ছেড়ে মর্ত্যলোকে রওনা হন।
:সনাতনীরা এই দিন ভোরে গঙ্গা বা নিকটবর্তী জলাশয়ে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য জল ও তিল অর্পণ (তর্পণ) করে পিতৃতর্পণ করেন।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ ও মহিষাসুরমর্দিনী শোনার মাধ্যমে বাঙালির ঘরে ঘরে পূজার আমেজ শুরু হয়।
মহাষষ্ঠী (দেবীর অধিবাস ও আমন্ত্রণ)ষষ্ঠী তিথিতে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটে। এই দিন দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস অনুষ্ঠিত হয়। মূলত বেলগাছের নিচে (বিল্বমূল) দেবীর বোধন করা হয়। আনন্দময়ী মায়ের মুখ দর্শনের মাধ্যমে পূজার মূল দিনগুলোর সূচনা হয়।
মহাসপ্তমী (নবপত্রিকা প্রবেশ ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা)সপ্তমীর সকালে পূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো 'নবপত্রিকা' বা 'কলাবউ' স্নান। নয়টি উদ্ভিদের সমন্বয়ে গঠিত এই নবপত্রিকাকে দেবীর নয়টি রূপের প্রতীক হিসেবে গঙ্গার ঘাটে স্নান করিয়ে নতুন শাড়ি পরানো হয় এবং গণেশের পাশে স্থাপন করা হয়। এরপর মণ্ডপে দেবী প্রতিমার প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে পূজা শুরু হয়।নবপত্রিকা হলো শারদীয় দুর্গোৎসব বা দুর্গাপূজার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অঙ্গ, যা সাধারণ মানুষের কাছে 'কলাবউ' নামেও পরিচিত।'নবপত্রিকা' শব্দের আক্ষরিক অর্থ নয়টি পাতা হলেও, বাস্তবে এটি নয়টি ভিন্ন উদ্ভিদের সমাহার। এই নয়টি উদ্ভিদ হলো: কলাগাছ বা রম্ভা, কচু, হরিদ্রা বা হলুদ গাছ, জয়ন্তী, বিল্ব বা বেল গাছ, ডালিম,অশোক, মানকচু, ধান গাছ,তার্তিক তাৎপর্য ও রীতি নয়টি রূপ: মহাষষ্ঠীর দিন এই নয়টি উদ্ভিদকে একত্র করে নতুন শাড়ি ও সিঁদুর পরিয়ে দেবীর নববধূর মতো সাজানো হয়। এগুলো আসলে দেবী দুর্গারই নয়টি বিশেষ রূপ বা প্রতীকরূপ বলে গণ্য করা হয়।
স্নান: সপ্তমী পূজার আগে নবপত্রিকাকে নদীর বা পবিত্র জলে স্নান করিয়ে পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়। মহাঅষ্টমী (অঞ্জলি ও সন্ধিপূজা)
পূজার সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ও ভক্তিপূর্ণ দিন হলো মহাঅষ্টমী।পুষ্পাঞ্জলি: এই দিন ভক্তরা উপবাস থেকে দেবীর চরণে অঞ্জলি প্রদান করেন।
কুমারী পূজা: অনেক মণ্ডপ বা আশ্রমে (যেমন রামকৃষ্ণ মিশন) শুদ্ধ হৃদয়ের ছোট বালিকাকে দেবী দুর্গারূপে পূজা করা হয়।
সন্ধিপূজা: অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট—এই মোট ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা হয়। এই সময়েই দেবী দুর্গা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুরকে বধ করে 'চামুণ্ডা' রূপ ধারণ করেছিলেন। ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে এবং ১০৮টি পদ্মফুল অর্পণ করে এইপূজা করা হয়।মহানবমী (নবমী ধুনুচি নাচ ও যজ্ঞ)
নবমী হলো পূজার শেষ আনন্দের দিন। এই দিন অগ্নিকে সাক্ষী রেখে মহানবমীর বিশেষ যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ পূজার আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। নবমীর রাত শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মর্ত্যলোকে দেবীর বিদায়ের করুণ সুর বাজতে শুরু করে।বিজয়া দশমী (বিসর্জন ও সিঁদুর খেলা)দশমী হলো দেবীর বিদায়ের দিন। মহিষাসুর বধের পর এই দিনটি বিজয়ের আনন্দ হিসেবে উদযাপিত হয়।দেবী বরণ ও সিঁদুর খেলা: বিবাহিত নারীরা দেবীর কপালে সিঁদুর ছোঁয়ান, মিষ্টি মুখ করান এবং নিজেরা মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়।বিসর্জন: বিকেলে বা সন্ধ্যায় অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দেবী প্রতিমাকে নদী বা জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে দেবী আবার কৈলাসে স্বামী শিবের কাছে ফিরে যান।শুভ বিজয়া: বিসর্জনের পর শুরু হয় কোলাকুলি, প্রণাম ও শুভেচ্ছা বিনিময়। ঘরে ঘরে তৈরি হয় নাড়ু, নিমকি ও মিষ্টি। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়।মহিষাসুর বধঃ মহিষাসুর নামক এক শক্তিশালী অসুর কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর লাভ করেন যে, কোনো পুরুষ বা দেবতা তাকে বধ করতে পারবে না। বর পেয়ে অহংকারী মহিষাসুর দেবতাদের স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে তা দখল করে নেন। বিতাড়িত দেবতারা নিরুপায় হয়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের শরণাপন্ন হন।
তখন সমস্ত দেবতাদের তেজঃপুঞ্জ থেকে এক পরম রূপবতী ও মহাশক্তিশালী দেবী আবির্ভূত হন—তিনিই দেবী দুর্গা। দেবতারা তাদের নিজস্ব দিব্য অস্ত্র (যেমন শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর চক্র, বরুণের শঙ্খ ইত্যাদি) দেবীকে দান করেন। হিমালয় দেবীকে বাহন হিসেবে একটি সিংহ উপহার দেন। এরপর দেবী দুর্গা মহিষাসুরের সাথে টানা নয় দিন ও নয় রাত যুদ্ধ করেন এবং দশম দিনে মহিষাসুরকে বধ করে স্বর্গরাজ্য উদ্ধার করেন। এই কারণে দেবীর আরেক নাম 'মহিষাসুরমর্দিনী'।শ্রী রামচন্দ্রের অকালবোধন ত্রেতা যুগে রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করার জন্য এবং সীতাকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে শ্রী রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। বসন্তকালের দুর্গাপূজাকে বলা হয় 'বাসন্তী পূজা', যা আদি পূজা। কিন্তু রামচন্দ্র লঙ্কা জয়ের উদ্দেশ্যে শরৎকালে অসময়ে দেবীকে জাগ্রত করেছিলেন বলে একে 'অকালবোধন' বলা হয়। রামচন্দ্র দেবী দুর্গার চরণে নীলপদ্ম অর্পণ করতে চেয়েছিলেন। ১০৭টি নীলপদ্ম পাওয়ার পর শেষ পদ্মটি না পেয়ে তিনি নিজের পদ্মসদৃশ চোখ দেবীকে উৎসর্গ করতে উদ্যত হন। ভক্তির চরম পরাকাষ্ঠা দেখে দেবী দুর্গা আবির্ভূত হয়ে রামচন্দ্রকে বিজয়ের বর দেন।
লায়ন বাসু চৌধুরী,
সাধারণ সম্পাদক,
বাগীশিক চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সংসদ।
