সংক্ষিপ্ত জীবনী
বাংলাদেশে প্রবর্তিত একমাত্র তরিকা, তরিকায়ে মাইজভাণ্ডারীয়ার মহান প্রবর্তক, আহলে বাইতে রাসূল, ইমামুল আউলিয়া, খাদেমুল অলদ, গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর অন্যতম খলিফা, ফানাফিল্লাহ-বাকাবিল্লাহ, মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আল্লামা রিজুয়ান উদ্দীন মাইজভাণ্ডারী (রহঃ), প্রকাশ শাহনগরী কেবলা।
আল্লামা রিজুয়ান উদ্দীন শাহনগরী (রহঃ) ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ফটিকছড়ি উপজেলার ১৩নং লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মাওলানা আব্দুল করিম। মাওলানা আব্দুল করিম একজন আলেম ও কামেল আউলিয়া ছিলেন, যাঁর অসংখ্য কেরামত রয়েছে বলে লোকমুখে শুনা যায়।আল্লামা শাহনগরীর পূর্বপুরুষ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুদূর আরব থেকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আব্দুল্লাহপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে আল্লামা শাহনগরীর পূর্বপুরুষেরা ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে (মসজিদের ইমামতি) করার সুবাদে শাহনগর গ্রামে বসবাস স্থাপন করেন।আল্লামা রিজুয়ান উদ্দীন শাহনগরী শৈশবে শাহনগর গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং গোল্ড মেডালিস্ট লাভ করেন।
পড়ালেখা শেষ করে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য হুজুর গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে বেলায়েত অর্জন করেন এবং কঠোর রিয়াজতে মশগুল থাকেন।তিনি দুনিয়াবি লোভ-লালসা ত্যাগ করে খোদার প্রেমে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে চট্টগ্রাম হাটহাজারী থানার অন্তর্গত ফরহাদাবাদ ও শফিনগর এলাকায় রিয়াজতের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। তিনি কঠিন সাধনা করেন এবং তাঁর পীর হুজুর গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এবং পরবর্তীতে ইউসুফে সানী হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী, প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারী (কঃ)-এর কাছ থেকে বেলায়েত অর্জন করে বেলায়েতের উচ্চ মোকামে গিয়ে পৌঁছেন।তাঁর বেলায়েতের মোকাম এত উঁচু ছিল যে, যখন আল্লামা শাহনগরী বাবা ভাণ্ডারী (কঃ)-এর হুজরা শরিফে প্রবেশ করতেন, তখন বাবা ভাণ্ডারী (কঃ) তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান করতেন এবং হুক্কা মোবারক গ্রহণ করার জন্য আরজ করতেন। কিন্তু আল্লামা শাহনগরী বাবা ভাণ্ডারীর হুক্কা মোবারকে সম্মান প্রদর্শন করে (চুমু দিয়ে) বাবা ভাণ্ডারীকে বলতেন—“আপনি হচ্ছেন সুলতানের সুলতান, আর আমি হচ্ছি গোলামের গোলাম।”
এই কথা বলে তিনি বাবা ভাণ্ডারী (কঃ) থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসতেন।
আল্লামা শাহনগরীর শান বর্ণনা করতে গিয়ে খলিফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী হযরত মাওলানা মোছহাব উদ্দীন শাহপুরী (রহঃ) বলেন—
“মাননীয় শাহনগরী আউলিয়ার প্রধান,
উলমা দপ্তরে আর গৌরব তাঁহান।”— রত্নভাণ্ডার।
আল্লামা শাহনগরী (রহঃ) দীর্ঘদিন আল্লাহর রিয়াজতে কঠোর সাধনার মাধ্যমে অতিবাহিত করেন। তাঁর সঙ্গে অসংখ্য আউলিয়া কেরাম চলাফেরা করতেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম খলিফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী মুফতিয়ে আজম সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদী (রহঃ) মাওলানা বজলুল করিম মন্দাকিনী (রহঃ), মাওলানা রহম আলী (রহঃ), মাওলানা করম আলী (রহঃ), মাওলানা আব্দুল হাদী কাঞ্চনপুরী (রহঃ) সহ অসংখ্য আউলিয়া কেরাম ছিলেন।লোকমুখে আল্লামা শাহনগরীর অসংখ্য কেরামতের কথা শোনা যায়। তার মধ্যে একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য—
ফটিকছড়ি সিনিয়র মাদ্রাসার সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা আমিনুল্লাহ সুন্দরপুরী (রহঃ) একদিন ভক্তবৃন্দসহ কোনো এক মাহফিল থেকে আসার সময় পথিমধ্যে আল্লামা শাহনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। আল্লামা শাহনগরী দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাওলানা আমিনুল্লাহ সুন্দরপুরী কাছাকাছি আসলে আল্লামা শাহনগরী তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “মওলানা সাহেব, আমার পায়খানার হাজত হয়েছে, আমার জন্য পানি নিয়ে আসেন।”
এই কথা বলে আল্লামা শাহনগরী জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেলেন। মাওলানা সুন্দরপুরী পানি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আল্লামা শাহনগরী হাজত শেষ করার পর মাওলানা সুন্দরপুরী নিজ হাতে তাঁকে পরিষ্কার করে দেন।
মাওলানা সুন্দরপুরী যখন আল্লামা শাহনগরীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন পেছনে থাকা এক ভক্ত বলে উঠলেন, “হুজুর, আপনি এই পাগল লোকটাকে কেন পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দিলেন?”
ভক্তের কথার উত্তরে মাওলানা সুন্দরপুরী তাঁকে চুপ থাকতে বলেন। কিন্তু ততক্ষণে আল্লামা শাহনগরী সামনে এসে বলে উঠলেন, “মওলানা সাহেব, মানুষ পায়খানা করলেও মরে, না করলেও মরে।”
সুন্দরপুরী তাঁর ভক্তকে বললেন, “তোমাকে আর বাঁচাতে পারলাম না।” সেই রাতে লোকটি পায়খানা বন্ধ হয়ে মারা যায়—এমনটি লোকমুখে বর্ণিত আছে।আল্লামা শাহনগরীর নিকট গ্রামের মানুষ দুধ, মধু, দইসহ অনেক খাবার নিয়ে আসতেন। তিনি সকল তরলজাতীয় খাবার দিয়ে শরবত তৈরি করে উপস্থিত আশেক-ভক্তদের খাওয়াতেন।একদিন এক ব্যক্তি কৃষিজমিতে পোকামাকড়ের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে এক বোতল বিষ নিয়ে আল্লামা শাহনগরীর নিকট দোয়ার জন্য আসেন। তখন আল্লামা শাহনগরী তাঁর আপন ভাতিজা মোহাম্মদ মিয়াকে উদ্দেশ্য করে শরবতে বিষের বোতলটি দিয়ে দিতে বলেন।তখন আশেক-ভক্ত ছাড়াও মাওলানা মকবুল আলী (রহঃ), মাওলানা আমিনুর রহমান (রহঃ) সহ অসংখ্য আলেম-উলামা উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ভাতিজা মোহাম্মদ মিয়া শাহনগরীর হুকুমমতো বিষের বোতলটি শরবতে ঢেলে দেন। এরপর উপস্থিত সকলের মাঝে শরবত বিতরণ করার পর বাকি শরবত সকলের পরিবারের জন্য দিয়ে দেওয়ার হুকুম করা হয়। লোকমুখে বর্ণিত আছে, বিষ মেশানো সেই শরবত পান করেও কারও কোনো ক্ষতি হয়নি।আল্লামা রিজুয়ান উদ্দীন শাহনগরী (রহঃ)-এর খেদমতে একজন মহিলা নিয়োজিত ছিলেন। তিনি নিয়মিত আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-এর ওজুর পানি গরম করে দিতেন এবং বিভিন্নভাবে তাঁর খেদমত করতেন।
একদিন ওই মহিলা নিজ বাড়ি থেকে আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-এর খেদমতে আসার পথে সন্ধ্যার পর লালপুল নামক স্থানে কয়েকজন দুষ্কৃতকারী তাঁকে আটকে রেখে অশোভন কথাবার্তা বলতে থাকে।
এ অবস্থায় ওই মহিলা আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-কে স্মরণ করে তাঁর সাহায্য কামনা করেন। লোকমুখে বর্ণিত আছে, এরপর ওই দুষ্কৃতকারীরা যেন দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং সারারাত সেই স্থানেই অন্ধের মতো ঘুরতে থাকে। আর ওই মহিলা নিরাপদে আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-এর খেদমতে পৌঁছে যান।পরবর্তীতে দুষ্কৃতকারীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয় এবং আল্লামা শাহনগরী (রহঃ)-এর কদম মোবারকে উপস্থিত হয়ে নিজেদের অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।আল্লামা শাহনগরীর নিকট অসংখ্য আলেম-উলামা আসা-যাওয়া করতেন। তাঁদের মধ্যে যারা শাহনগরীর কাছ থেকে বেলায়েত অর্জন করে কামেল আউলিয়া হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—মাওলানা আমিন ফকির (রহঃ), গোপালঘাটা; মাওলানা আব্দুল গফুর শাহ (রহঃ), ফটিকছড়ি; মাওলানা মকবুল শাহ (রহঃ), গোপালঘাটা; মাওলানা আমিনুল্লাহ সুন্দরপুরী (রহঃ), ফটিকছড়ি—সহ আনেকে রয়েছেন।এই মহান জাতেপাক ১০ আশ্বিন, ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে, ৭৫ বছর বয়সে ওফাত বরণ করেন।
প্রতি বছর ১৫ মাঘ, ২৯ জানুয়ারি, হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর ওরশ এবং আল্লামা শাহনগরীর বেলাদত ও বেলায়েত বার্ষিকী উপলক্ষে ওরশ শরিফ এবং ১০ আশ্বিন বার্ষিক ওরশ শরিফ মহাসমারোহে শাহনগরীর রওজা মোবারক প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়।
✍️
শেখ মুহাম্মদ ইসমাইল
সংগঠক ও সমাজকর্মী
