আজ ১৫ জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, বাংলা বর্ষের হিসাবে ১৪৩২ বঙ্গাব্দের ১লা মাঘ, ত্বরিকায়ে মাইজভাণ্ডারীয়ার প্রতিষ্ঠাতা প্রাণ পুরুষ খাতেমুল অলদ, ইমামুল আউলিয়া গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী। আজ থেকে দুই শত বৎসর পূর্বে ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারী, ১২৩৩ বংলা সনের ১লা মাঘ এই মহান আধ্যাত্মিক মহা পুরুষ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার গ্রামে আবির্ভূত হন। বর্তমান বিশ্বে তাঁর প্রবর্তিত ত্বরিকা তাসাওউফ সাধনার অন্যতম অনুশীলন পদ্ধতি হিসেবে বিশেষভাবে সমাদৃত। উল্লেখ্য, ইসলামী তাসাওউফ সাধনার ক্ষেত্রে ত্বরিকায়ে মাইজভাণ্ডারীয়া হচ্ছে বাংলা ভূখণ্ডে একজন বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম মনীষী কর্তৃক উদ্ভাবিত সুফি সাধনা পন্থা। এই ত্বরিকার সাধন পন্থা ইসলাম ধর্মের মৌলিক আক্বিদার পাশাপাশি স্থানীয় লোক সংস্কৃতিও অভাজিত পন্থায় আদৃত হয়েছে। এই মহান মনীষী রক্ত-বংশ সূত্রে বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (দ.)’র সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।
উল্লেখ্য, বিশ্বনবী রহমতুল্লিল আলামিন হযরত মোহাম্মদ মোস্তফার (দ.) বংশধারা হযরত ইমাম হাসান (রা.) ও হযরত ইমাম হোসাইনের (রা.) উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমে বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। কালক্রমে এই দুই পবিত্র ধারার সম্মিলন ঘটে পীরানে পীর দস্তগীর কুতুবে রাব্বানী মাহবুবে সোবহানী গাউসুল আযম হযরত সৈয়দ মহীউদ্দিন আবদুল কাদের জিলানীর (ক.) মধ্যে। তাঁর পিতৃকুল ছিল হাসানী এবং মাতৃকুল ছিল হোসাইনী। এই মিশ্রিত ধারা ক্রমান্বয়ে এশিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং এই ধারার ব্যক্তিবর্গ হেদায়ত ও বিচার প্রভৃতি মর্যাদাসম্পন্ন কাজে নিয়োজিত থেকে মানব জাতির খেদমত আঞ্জাম দিতে থাকেন। পীরানে পীর দস্তগীরের (ক.) অধঃস্তন বংশধর ও কাদেরিয়া ত্বরিকার খেলাফতপ্রাপ্ত গাউসে কাওনাইন শেখ সৈয়দ আবু শামা মোহাম্মদ সালেহ লাহোরী আল-কাদেরী (রহ.) এবং তাঁর অগ্রজ চিরকুমার শাহ্ সৈয়দ দেলোয়ার আলী পাকবাজ (রহ.) উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধেও জীবিত অবস্থায় তদানীন্তন ভারতবর্ষে হেদায়েতের প্রস্রবন জারী রেখেছিলেন। যাদের নুরানী সংস্পর্শে এসে আধ্যাত্মিক উরুজ অর্জন করেন হযরত গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) খ্রিস্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের প্রথম দশকের কোন এক সময়ে।
হযরত গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর (ক.) পূর্বপুরুষরা ছিলেন পীরানে পীর দস্তগীর আবদুল কাদের জিলানীর (ক.) বংশ লতিকার সাথে সম্পৃক্ত এবং সে সূত্রে হযরত ইমাম হাসান (রাদ্বি.) ও হযরত ইমাম হোসাইন (রাদ্বি.) এর সূত্র ধরে মহানবি (দ.) পর্যন্ত সংযুক্ত। তাঁর পূর্বপুরুষরা কালক্রমে খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তদানীন্তন বাংলার সুলতানের আমন্ত্রণে রাজধানী গৌড় নগরে ইমামতি, কাজী প্রভৃতি মর্যাদাপূর্ণ পদে আসীন হন। এঁদেরই একজন সৈয়দ হামিদ উদ্দিন গৌড়ী রাজধানীতে কাজী পদে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি গৌড়ী লকব ধারণ করেন। এ সময়ে এক মহামারীতে গৌড় প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ হামিদ উদ্দীন গৌড়ী রাজধানী গৌড় থেকে চট্টগ্রামে হিযরত করেন এবং চট্টগ্রামের পটিয়া থানার কাঞ্চননগরে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর নামানুসারেই স্থানীয় গ্রামের নামকরণ করা হয় হামিদগাঁও, যা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘হাইদগাঁও’, নামে অভিহিত। তাঁর এক পুত্র সৈয়দ আবদুল কাদের মসজিদের ইমামতি উপলক্ষে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার অন্তর্গত আজিমনগর গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। সৈয়দ আবদুল কাদেরের পুত্র সৈয়দ আতাউল্লাহ এবং তদীয় পুত্র সৈয়দ তৈয়বউল্লাহ। সৈয়দ তৈয়ব উল্লাহর তিন পুত্রের অন্যতম মৌলভী সৈয়দ মতিউল্লাহ আজিমনগর থেকে মাইজভাণ্ডার গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। তাঁর ঔরসে জন্ম নেন মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.)। তাঁর মায়ের নাম বেগম খায়েরুন্নেসা বিবি।
হযরত গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর (ক.) বাল্যকালীন শিক্ষা তাঁর গ্রাম্য মক্তবে শুরু হয়। তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন ফটিকছড়ি থানার অন্তর্গত আজিমপুর গ্রামের হযরত মওলানা মোহাম্মদ শফি সাহেবের নিকট। তিনি একজন প্রসিদ্ধ সাহেবে কশ্ফ আলেম ছিলেন। মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি ১২৬০ হিজরী সনে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করতে গমন করেন। তথায় ১২৬৮ হিজরী সনে কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকাহ্ প্রভৃতি শাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শিতার সাথে শেষ পরীক্ষায় পাশ করেন। মাদ্রাসা আলিয়ায় অধ্যয়নকালে তিনি হযরত সুফি নূর মোহাম্মদ সাহেবের বাসায় অবস্থান করতেন। সুফি নূর মোহাম্মদ সাহেব একজন মোজাহেদ আলেম ছিলেন। শিক্ষা শেষে হযরত গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.) ১২৬৯ হিজরী সনে যশোহর জেলার কাজী পদে নিয়োজিত হন। উক্ত পদে ইস্তফা দেওয়ার পর তিনি কলিকাতার মাটিয়া বুরুজে মুন্সী বু আলী সাহেবের মাদ্রাসায় অধ্যাপনায় আত্মনিয়োগ করেন। সেই সময় সুপ্রসিদ্ধ বাগদাদবাসী হযরত পীরানে পীর দস্তগীর গাউসুল আযম মুহীউদ্দীন সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী (ক.) এর বংশধর ও উক্ত ত্বরিকার খেলাফতপ্রাপ্ত সোলতানুল হিন্দ গাউসে কাওনাইন শেখ সৈয়দ আবু শামা মোহাম্মদ সালেহ লাহোরী আলকাদেরীর (রহ.) নিকট হতে তিনি মুরাদ প্রাপ্ত হয়ে বিল বিরাসত গাউসিয়তের ফয়জ ও খেলাফত হাসিল করেন। পরে তিনি তাঁর পীরে ত্বরিকতের বড় ভাই হযরত শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলোয়ার আলী পাকবাজ (চির কুমার) মোহাজেরে মদনী লাহোরী হতে ইত্তেহাদী কুতবিয়তের ফয়জ হাসিল করেন। তিনিই হযরতের পীরে তাফাইয়োজ। হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) কামেলে মোকাম্মেল বা পূর্ণ মানবতা অর্জনকারী এবং অন্যকে মানবতা বা খোদায়ী ফজিলত দানকারী বলে সাব্যস্ত হন। তিনি বিল আসালত বা স্বভাব সিদ্ধ জন্মগত অলি উল্লাহ্ ছিলেন। তিনি পীরে কামেলের খেদমত সোহবত এবং খেলাফত হাসিলপূর্বক বেলায়েতপ্রাপ্ত হন। তিনি যথার্থ জাহেরী বাতেনী শিক্ষা দীক্ষা এবং ফয়জে ইত্তেহাদী ও ইলমে লদুনি হাসেল দ্বারা বিদ দারাসাত বেলায়েত মরতবাপ্রাপ্ত হন। বিল-মালামাত তিনি মোখালেফাতে নফস বা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণে মোজাহেদা ও মোশাহেদার কঠোর সাধনার বদৌলতে বেলায়েতের চতুর্বিধ দরজার সর্বোচ্চ মোকাম্মেল মালামিয়া মশরব, বিশ্বঅলি সাব্যস্ত হন। হযরত গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.) ঊনআশি বৎসর বয়সে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি মোতাবেক ২৭ জিলকদ ১০ মাঘ সোমবার দিবাগত রাত এক ঘটিকার সময় ওফাতপ্রাপ্ত হন।
হযরত সাহেব কেবলার আধ্যাত্মিক আবির্ভাবের মাধ্যমে বাংলাভাষায় বাঙ্গালী ঘরানায় পবিত্র মহান মা’রিফত ধারার সূত্রপাত ঘটে। শুধু তাই নয়, নৈর্ব্যক্তিক মানবতাবাদী চেতনা নবতর রূপ পরিগ্রহ করে বাংলাদেশ তথা বিশ্বকে নতুন আলোকে উদ্ভাসিত করে চলমান আছে।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক আলোকধারা